মোবাইল-টাকা দিয়েও ধর্ষকদের থামাতে পারেননি

0
92

অভাবের সংসারে বাবা নেই। নিজের চেষ্টা আর অনেক কষ্টে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন মাশরুফা আক্তার রুপা। স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রুপার সেই স্বপ্ন খুন হয়ে যায় একদল পাষণ্ডের বর্বরতায়। টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা করে বনে লাশ ফেলে দেয়া হয়।

নিষ্ঠুরতম এ ঘটনার সময় রুপা তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন দিয়ে তাকে ধর্ষণ না করতে অনুরোধ করেছিলেন ধর্ষকদের। কিন্তু যার পায়ে পড়ে তিনি অনুরোধ করেছিলেন সেই বাস হেলপারই জোরপূর্বক প্রথমে রুপাকে ধর্ষণ করেছিল। পরে অন্যরা তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে।

ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর আজ সোমবার টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রুপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বাসের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫), জাহাঙ্গীর (১৯) ও চালক হাবিবুরকে (৪৫) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

গত ২৯ আগস্ট আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে আসামি বলেন, ঘটনার সময় রুপা তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন শামীমকে দিয়ে তাকে ধর্ষণ না করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু শামীমই প্রথম রুপাকে ধর্ষণ করে। পরে অপর হেলপার আকরাম ও জাহাঙ্গীরও তাকে ধর্ষণ করে।

হত্যাকাণ্ডের পর দিন বেওয়ারিশ হিসেবে মধুপুরে রুপার লাশ দাফন করা হয়েছিল। তিন দিন পর তার পরিচয় মিলে। তখন জানা যায়, তার নাম রুপা প্রামাণিক (২৫)। তিনি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জিলহাস প্রামাণিকের মেয়ে।

রুপা বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ঢাকা আইডিয়াল ল’ কলেজে এলএলবি শেষ পর্বের অধ্যয়নরত ছিলেন। পাশাপাশি ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রমোশনাল বিভাগে শেরপুর জেলায় কাজ করতেন তিনি। পুলিশ জানায়, গত ২৫ আগস্ট রুপা বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার উদ্দেশ্যে ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে সন্ধ্যা ৭টার দিকে রওনা হন। ওই দিন রুপা ছাড়াও মাত্র পাঁচ-ছয়জন যাত্রী বাসে ছিল। রুপা ছাড়া অন্য সব যাত্রী সিরাজগঞ্জ মোড় এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নেমে যায়। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার সময় রুপা একাই বাসে ছিলেন।

বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাছাকাছি এলে বাসের হেলপার শামীম রুপাকে জোর করে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। এ সময় রুপা তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন শামীমকে দিয়ে তাকে ধর্ষণ না করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর তাকে ধর্ষণ করে।

বাসটি ঘাটাইল উপজেলা এলাকা অতিক্রম করার সময় রুপা কান্নাকাটি ও চিৎকার করা শুরু করলেও তারা তিনজন মুখ চেপে ধরে। একপর্যায়ে ঘাড় মটকে রুপাকে হত্যা করা হয়। পরে মধুপুর উপজেলা সদর অতিক্রম করে বন এলাকা শুরু হলে পঁচিশমাইল নামক একটি জায়গায় রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রেখে চলে যায়। ঘটনার রাতেই পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে মধুপুর থানায় নিয়ে যায়। পর দিন টাঙ্গাইল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্তানে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। ২৭ আগস্ট পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মধুপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করে।

এদিকে রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত রুপার সঙ্গে তার বড় ভাই হাফিজুর রহমান প্রামাণিকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু এর পর থেকেই রুপার ফোন বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানান হাফিজুর রহমান। পর দিন শনিবার কোনো খোঁজখবর না পেয়ে হাফিজুর ময়মনসিংহ যায় এবং ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় এ ব্যাপারে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

পরে মধুপুর বনাঞ্চলে একজন তরুণীর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে হাফিজুর সোমবার রাতে মধুপুর থানায় যান। থানায় সংরক্ষিত লাশের ছবি দেখে রুপার লাশ শনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ২৮ আগস্ট রাতেই বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী ছোঁয়া পরিবহন বাসটি মধুপুর অতিক্রম করার সময় চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে।

থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। পরে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আকরাম ও জাহাঙ্গীরের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। শামীমের বাড়ি মুক্তাগাছার নন্দিবাড়ি। অন্যদিকে বাসচালক হাবিব (৪৫) ও সুপারভাইজার সফর আলীর বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে।

Loading...
(Visited 32 times, 1 visits today)