সেই লম্পট শিক্ষকের অপকর্মের বর্ণনা দিলো ছাত্রী

মাদারীপুরের শিবচর উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে তিন বছর ধরে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা সেই শিক্ষক রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই ছাত্রীর মা।

গত সোমবার রাতে শিবচর থানায় মামলাটি করা হয়। মামলার এক মাত্র আসামি শিক্ষক রবিউল গত দেড় মাস ধরে পলাতক। মায়ের সঙ্গে থানায় মামলা করতে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই ছাত্রী। কান্না করতে করতে পুলিশের কাছে শিক্ষক রবিউলের অপকর্মের বর্ণনা দেয় ছাত্রী।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিবচর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ওই ছাত্রীকে নিয়ে তার মা থানায় আসেন। তখন মেয়েটি কান্না করছিল। কান্নারত অবস্থায় ওই ছাত্রী রবিউলের নানা অপকর্মের বর্ণনা দেয়। পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) শাজাহান মিয়া এবং আমি ওই ছাত্রীকে বারবার স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। রবিউলকে গ্রেফতার ও শাস্তির আশ্বাস দিই। তবুও কিছুতেই থামছিল না মেয়েটির কান্না। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাদের বাড়ি পাঠাই।

ওসি আরো বলেন, শিক্ষক রবিউলের বিরুদ্ধে মেয়েটি যে তথ্য দিয়েছে তা রোমহর্ষক। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে তিন বছর ধরে ওই ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছে রবিউল। এছাড়া আরও দুই ছাত্রী অভিযোগ দিয়েছে। মামলা হয়েছে। মামলা ও স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে রবিউলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি আমরা। তাকে ধরতে ইতোমধ্যে আমাদের অভিযান শুরু হয়েছে।

ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর দাবি, পুলিশ নিজে থেকেই আমাদের বাড়ি ও স্কুলে গিয়ে ঘটনার খোঁজ-খবর নিয়েছে। আমি রবিউলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

মামলার বাদী ছাত্রীর মা বলেন, শিক্ষক রবিউল আমার মেয়েসহ অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। আমরা তার শাস্তি চাই।

প্রসঙ্গত, উপজেলার উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রবিউল ইসলাম ৫ম ও ৮ম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রীদের দেখভাল করতো। সেইসঙ্গে ছাত্রীদের ফ্ল্যাটে নিয়ে দাওয়াত খাওয়াতো ও পড়াতো।

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বলেন, রবিউল স্যার আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নিতেন। পরে অন্য কয়েকজনের সাথে আমাকেও বাসায় নিয়ে পড়াত। আমার মতো আরও কয়েকজন সিনিয়র আপাকেও সে একই কায়দায় ফাঁসিয়েছে।

স্কুলের সুন্দরী মেয়েদের সে ৭ম বা ৮ম শ্রেণি থেকেই টার্গেট করে বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে এই জঘন্য কাজ করে আসছিল।

এর মধ্যে বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির এক ছাত্রীর ওপর নজর পড়ে তার। ওই ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে রবিউল। এরপর তাকেও ফ্ল্যাটে নিয়ে দাওয়াত খাওয়ায় ১ সন্তানের জনক রবিউল।

স্ত্রী অন্য উপজেলায় চাকরি করার সুবাদে রবিউলের ফ্ল্যাটে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতো সবাই। এর মধ্যে একদিন ৭ম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে রবিউল।

এরপর শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। ধর্ষণের ওই ভিডিও ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে একাধিক বার ধর্ষণ করা হয় ওই ছাত্রীকে। এভাবে চলে তিন বছর। এর মধ্যে একাধিকবার ছাত্রীর গর্ভপাত ঘটায় রবিউল।

কিছুদিন আগে অন্য ছাত্রীদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেয়া দেখে আপত্তি জানায় ওই ছাত্রী। একপর্যায়ে ছাত্রী জানতে পারে, বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন ছাত্রীকে একই ধরনের কাজে বাধ্য করেছে রবিউল। তাদের সঙ্গেও রবিউলের অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি সবাইকে জানানোর কথা বললে ওই ছাত্রীকে আবারও ধর্ষণ করে রবিউল। এভাবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রবিউল ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে।

অবশেষে উপায় না পেয়ে রবিউলের বিচার চেয়ে গত ১৩ মার্চ ওই ছাত্রী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়। এরপরই একের পর এক বের হয়ে আসে রবিউলের অপকর্মের তথ্য।

৮ম, ৯ম ও দশম শ্রেণির আরও তিন ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে নাম প্রকাশে না করার শর্তে শিক্ষক রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির কাছে। সেইসঙ্গে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে রবিউলের আপত্তিকর ছবি অডিও ও ভিডিও দেয় তারা।

এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকনুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই পালিয়ে গিয়ে এখন ফোনে ওই ছাত্রীকে হুমকি দিচ্ছে। আমরা শিক্ষকরা পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের সাথে আলোচনা করেছি। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পারভীন বেগম বলেন, ওই ছাত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি আমরা যখন জানতে পারি তখন রবিউলকে জিজ্ঞাসা করলে আমাদের কাছে সে বিষয়টি স্বীকার করেছে। এটার সঠিক বিচার হওয়া উচিত।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কাদির খালাসী বলেন, আমরা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। দ্রুতই অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযোগ ওঠার পরই বিদ্যালয় থেকে ছুটি না নিয়ে পালিয়ে যায় শিক্ষক রবিউল। অবশেষে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

Loading...
(Visited 5 times, 1 visits today)